অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম

প্রতি বছর ইনকাম ট্যাক্স বা আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার কথা শুনলেই অনেকে বেশ ভয় পেয়ে যান। ট্যাক্স অফিসে যাওয়া, বড় বড় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা উকিলদের পিছে ঘুরে বাড়তি টাকা খরচ করার ঝামেলার কথা ভেবে অনেকেই কাজটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেলে রাখেন। তবে সরকারের অনলাইন ই-রিটার্ন ওয়েবসাইট চালু হওয়ার পর থেকে এই সব ঝামেলা একদম শেষ হয়ে গেছে।

এখন কোনো লোক বা দালালের সাহায্য ছাড়াই নিজের ঘরে বসে মাত্র ১০-১৫ মিনিটে কম্পিউটার বা মোবাইল দিয়ে নিজের রিটার্ন নিজে জমা দিয়ে দেওয়া যায়। আপনি যদি প্রথমবার অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে চান, তবে নিচে সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে পুরো নিয়মটা বুঝিয়ে দেওয়া হলো।


পেজ সূচিপত্র : অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম ধাপে ধাপে


ধাপ ১: কাজের আগের কিছু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও কাগজপত্র গোছানো

ওয়েবসাইটে ঢোকার আগেই সব কাগজপত্র আর তথ্য হাতের কাছে গুছিয়ে রাখা ভালো। এতে ফরম পুরণের সময় আপনাকে বারবার উঠতে হবে না।

1. আপনার ১২ সংখ্যার টিআইএন (TIN) নম্বরটি একটি কাগজে লিখে বা ফোনে সেভ করে রাখুন।

2. একাউন্ট খোলার জন্য এমন একটি মোবাইল নম্বর লাগবে, যে সিমটি আপনার নিজের ভোটার আইডি কার্ড দিয়ে বায়োমেট্রিক নিয়মে কেনা। কারণ ওই নম্বরেই মেসেজের মাধ্যমে ভেরিফিকেশন কোড আসবে।

3. আপনি যদি চাকরি করেন, তবে অফিস থেকে সারা বছরের বেতনের একটা হিসাব বা বেতন নেওয়ার কাগজ (স্যালারি সার্টিফিকেট) চেয়ে নিন।

4. গত বছরের ১ জুলাই থেকে এই বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আপনার ব্যাংকের যাবতীয় লেনদেনের স্টেটমেন্ট তুলে রাখুন। ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার মুনাফা থেকে ব্যাংক কত টাকা কেটে রেখেছে, সেই কাগজটাও সংগ্রহে রাখুন।

5. আপনার নামে যদি সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, জীবনের বীমা বা শেয়ারবাজারে টাকা লাগানো থাকে, তবে সেগুলোর আসল রসিদগুলো সামনে রাখুন।

6. নিজের নামে থাকা জায়গা-জমি, বাড়ি, সোনাদানা, গাড়ি কিংবা ব্যাংকে জমে থাকা টাকার একটি হিসাব এবং সারা বছরে সংসার চালাতে কত খরচ হয়েছে, তার একটা আনুমানিক হিসাব আলাদা কাগজে লিখে রাখুন।

ধাপ ২: অনলাইন ওয়েবসাইটে নিজের একাউন্ট তৈরি করা

আপনার যদি আগে কখনো এই ওয়েবসাইটে একাউন্ট করা না থাকে, তবে শুরুতেই একটা নতুন একাউন্ট খুলে নিতে হবে। আপনার ফোনের বা কম্পিউটারের ইন্টারনেট ব্রাউজার খুলে আয়কর অফিসের মূল ই-রিটার্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।

1. ওয়েবসাইটের ওপরের দিকে থাকা রেজিস্ট্রেশন বাটনে চাপ দিন।

2. নির্দিষ্ট ঘরে আপনার ১২ সংখ্যার টিআইএন নম্বরটি কোনো ভুল করা ছাড়া লিখুন।

3. আপনার নিজের ভোটার আইডি কার্ড দিয়ে আপনার মোবাইল নম্বরটি টাইপ করে লিখুন ।

4. স্ক্রিনে একটি নিরাপত্তা কোড দেখা যাবে, সেটি দেখে দেখে হুবহু নির্দিষ্ট বাক্সে লিখুন এবং ভেরিফাই বাটনে চাপ দিন।

5. একটু পরেই আপনার মোবাইলে মেসেজে একটি গোপন কোড আসবে, সেটি বক্সে বসিয়ে মোবাইল ভেরিফাই করে নিন।

6. এবার নিজের মতো করে একটা গোপন পাসওয়ার্ড সেট করুন, যা দিয়ে পরবর্তীতে লগইন করতে পারবেন।

7. (আমি যখন প্রথম এখানে একাউন্ট খুলছিলাম তখন আমার কোড আস্তে 2 মিনিট সময় লেগেছিল তাই একটু ধৈর্য ধারণ করতে হবে) ।

ধাপ ৩: একাউন্টে ঢোকা ও মূল ফর্মে প্রবেশ

1. ওয়েবসাইটের সাইন ইন অপশনে ক্লিক করে আপনার টিআইএন নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে একাউন্টে ঢুকুন।

2. একাউন্টে ঢোকার পর ই-রিটার্ন বক্সে চাপ দিন এবং সেখান থেকে রিটার্ন জমার অপশন বেছে নিন।

3. কোন বছরের আয়কর দিচ্ছেন, সেই বছরের ঘরটা সিলেক্ট করুন।

4. আপনি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকেন কি না—সেই প্রশ্নে রেসিডেন্ট বা স্থায়ী বাসিন্দা সিলেক্ট করুন।

5. সারা বছর আপনার আয় কোনো কোনো খাত থেকে এসেছে (যেমন: চাকরি, ব্যাংক জমার সুদ, ব্যবসা বা বাসা ভাড়া)—সেই ঘরগুলোতে টিক চিহ্ন দিন।

6. আপনি যদি কোনো বিশেষ ছাড় পাওয়ার যোগ্য হন (যেমন: নারী, বয়স্ক নাগরিক বা বীর মুক্তিযোদ্ধা), তবে সেই বক্সে টিক দিয়ে দিন।

ধাপ ৪: সারা বছরের আয়ের পুরো হিসাব দেওয়া

এই ধাপে আপনাকে দেখাতে হবে সারা বছর আপনার পকেটে মোট কত টাকা এসেছে এবং কোন কোন খাত থেকে আপনি এই টাকা পেয়েছেন।

7. চাকরির আয়ের ঘরে স্যালারি সার্টিফিকেট দেখে দেখে মূল বেতন, বাসা ভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও ঈদ বোনাসের টাকা আলাদা আলাদা বক্সে বসিয়ে দিন।



8. ব্যাংকে টাকা রেখে কোনো লাভ পেয়ে থাকলে কিংবা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বা অন্য যেকোনো উপায়ে আয় হয়ে থাকলে সেই টাকার পরিমাণ নির্দিষ্ট ঘরে লিখুন।

9. ব্যবসা বা নিজের ঘর ভাড়া দেওয়া থেকে আয় থাকলে, খরচ বাদ দিয়ে আসল আয়ের অঙ্কটি লিখুন।

10. এই ওয়েবসাইটে তথ্য দেওয়ার সময় আপনাকে কষ্ট করে কোনো যোগ-বিয়োগ করতে হবে না, আপনি সঠিক সংখ্যা বসালেই ওয়েবসাইট নিজে থেকেই আপনার মোট বাৎসরিক আয়ের হিসাব বের করে ফেলবে।

ধাপ ৫: বিনিয়োগ ও কর ছাড়ের তথ্য দেওয়া

সরকারের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় টাকা জমালে বা বিনিয়োগ করলে করের ওপর বেশ বড় অঙ্কের টাকা ছাড় বা মওকুফ পাওয়া যায়।

1. আপনি যদি সারা বছরে জীবন বীমার কিস্তি দিয়ে থাকেন, তবে পরিশোধ করা টাকার পরিমাণ লিখুন।

2. ব্যাংকে প্রতি মাসে ডিপিএস জমালে বা সঞ্চয়পত্র কেনা থাকলে সেই জমানো টাকার পরিমাণ ফর্মে বসান।

3. শেয়ারবাজারে কোনো নতুন বিনিয়োগ থাকলে সেটিও উল্লেখ করুন।

4. এই তথ্যগুলো দেওয়ার সাথে সাথে সিস্টেম নিজে থেকেই হিসাব করে দেখিয়ে দেবে যে এই জমানো টাকার কারণে আপনার আসল ট্যাক্স থেকে কত টাকা মাফ হলো।

ধাপ ৬: নিজের সম্পত্তি, দেনা ও খরচের বিবরণ দেওয়া

নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় বা সম্পত্তি যাদের আছে, তাদের নিজেদের সব সম্পদের বিবরণ দেওয়া বাধ্যতামূলক।

1. ব্যাংকে জমে থাকা টাকা, ডিপিএসের জমা টাকা, সোনাদানা এবং ঘরের দামি ইলেকট্রনিক জিনিসের আনুমানিক দাম সম্পদের ঘরে লিখুন।

2. নিজের নামে থাকা জায়গা-জমি, ফ্ল্যাট বা দোকানের তথ্য ও দাম স্থাবর সম্পদের ঘরে বসান।

3. কোনো ব্যাংক লোন বা কারও কাছে দেনা থাকলে সেই ঋণের পরিমাণ দায়ের ঘরে লিখুন।

4. সারা বছরে আপনার পরিবারের খাবার খরচ, বাসা ভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা, কারেন্ট বিল ও ডাক্তার দেখানোর পেছনে কত টাকা খরচ হয়েছে, তার একটা আনুমানিক বাস্তব হিসাব দিয়ে দিন।

5. এখানে আপনার যাবতীয় যত খরচ আছে সেগুলো উল্লেখ করতে হবে । 

ধাপ ৭: ট্যাক্স কত হলো তা দেখা ও অনলাইনে টাকা দেওয়া

সব তথ্য পূরণ করা হয়ে গেলে ওয়েবসাইটটি আপনার সব হিসাব মিলিয়ে একদম শেষ ফলাফল দেখাবে।

1. আপনার সারা বছরের মোট আয় যদি সরকারের বেঁধে দেওয়া করমুক্ত সীমার নিচে থাকে, তবে আপনার ট্যাক্সের পরিমাণ দেখাবে ০ টাকা। একে সহজ ভাষায় জিরো রিটার্ন বলে। এতে আপনাকে অতিরিক্ত কোনো টাকা দিতে হবে না।

2. আর যদি আপনার আয় বেশি থাকে এবং ট্যাক্স দিতে হয়, তবে ছাড় দেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত সরকারকে কত টাকা দিতে হবে তা স্ক্রিনে ভেসে উঠবে।

3. এই টাকা দেওয়ার জন্য আপনাকে আর ব্যাংকে যেতে হবে না। আপনি সরাসরি ওয়েবসাইট থেকেই বিকাশ, নগদ, রকেট বা যেকোনো ব্যাংক কার্ড দিয়ে ঘরে বসেই টাকা জমা দিতে পারবেন।

4. টাকা জমা দেওয়া শেষ হলে একটা অনলাইন টাকা দেওয়ার রসিদ দেখতে পাবেন, সেটি সেভ করে রাখুন।

ধাপ ৮: ফরম ঠিক আছে কিনা দেখা ও শেষ জমা দেওয়া

একবার সাবমিট করে দিলে ফরম আর সহজে বদলানো যায় না, তাই শেষ জমা দেওয়ার আগে ভালো করে চোখ বুলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

1. পেজের নিচে থাকা প্রিভিউ রিটার্ন বাটনে ক্লিক করুন।

2. পুরো ফরমটা স্ক্রিনে ওপেন হবে। সেখানে আপনার নাম, এনআইডি নম্বর, আয়ের হিসাব আর ব্যাংকের সব তথ্য ঠিক আছে কিনা ভালো করে পড়ে নিন।

3. কোনো ভুল দেখলে পেছনে ফিরে গিয়ে আবার ঠিক করে নিন।

4. সবকিছু ১০০% ঠিক থাকলে সাবমিট বাটন চাপুন। আপনার রিটার্ন সফলভাবে জমা হয়ে যাবে।

ধাপ ৯: জমার অফিশিয়াল রসিদ ও কাগজ ডাউনলোড করা

রিটার্ন জমা শেষ হওয়ার পর আপনার মূল কাজ শেষ। এবার আপনার জমাকৃত আবেদনের সরকারি প্রমানপত্রগুলো সাথে সাথে ডাউনলোড করে নিন।

1. সাবমিট করার পরেই স্ক্রিনে প্রাপ্তিস্বীকার পত্র বা একনলেজমেন্ট স্লিপ এবং ট্যাক্স সার্টিফিকেট ডাউনলোডের লিংক আসবে।

2. এই কাগজগুলোতে সরকারি কিউআর কোড থাকে, যা থেকে বোঝা যায় এটি আসল কাগজ।

3. কাগজ দুটি সঙ্গে সঙ্গে ডাউনলোড করে আপনার ফোন বা পিসিতে সেভ করে রাখুন এবং এক কপি প্রিন্ট করে নিজের ফাইলে রেখে দিন।

4. পরবর্তীতে ব্যাংক লোন নিতে, ক্রেডিট কার্ড বানাতে, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে কিংবা জমি কেনাবেচা করতে এই অনলাইন প্রাপ্তিস্বীকার পত্রটিই মূল কাগজ হিসেবে জমা দিতে পারবেন।

অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার কিছু দরকারি টিপস

5. আয়কর জমা দেওয়ার শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা না করে কয়েকদিন আগেই কাজটা শেষ করে ফেলুন। শেষ মুহূর্তে সার্ভারে বেশ ভিড় থাকে।

6. ব্যাংক স্টেটমেন্ট আর স্যালারি সার্টিফিকেটে যে সংখ্যা আছে, হুবহু সেই সংখ্যাই লিখবেন। বানিয়ে কোনো হিসাব দিলে পরে সমস্যায় পড়তে পারেন।

7. আপনার একাউন্টের পাসওয়ার্ড বা সিকিউরিটি কোড সবসময় গোপন রাখুন।

চূড়ান্ত ফলাফল

এভাবে ধাপে ধাপে সব নিয়ম মেনে চললে যে কেউ ঘরে বসে খুব সহজে নিজের আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। রিটার্ন পলিসি অফিসে গিয়ে সকল ঝামেলার থেকে বাঁচতে ই রিটার্ন পলিসি এটা অনেক উত্তম । আপনি খুব সহজেই ঘরে বসে এগুলো কাজ ধাপে ধাপে অনুসরণ করে কাজগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন । এ 

সকল আরও তথ্য পেতে আমাদের ব্লগ ওয়েবসাইটটি অনুসরণ করুন । আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।


 


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

Md. alamin
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও অল অভার ইনসাইড এর CEO। তিনি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। 2 বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সফল হতে সহায়তা করে যাচ্ছেন।